
অ্যাজোস্পার্মিয়া- আই ভী এফ ছাড়া কী বাচ্চা নেয়া সম্ভব?
অ্যাজোস্পার্মিয়া নিয়ে যে পেশেন্টরা আমাদের কাছে আসে তারা প্রায়শই জানতে চায় যে IVF,TESA, PESA,বা MicroTESE ছাড়া তারা কি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বাচ্চা নিতে পারবেন না?
তাহলে অ্যাজোস্পার্মিয়ার পেশেন্টগুলোর মধ্যে আমরা আজকে সেই পেশেন্টগুলোকে নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করব যারা আইএফ ছাড়াও বাচ্চার জন্য চেষ্টা করতে পারে। এই পেশেন্ট গুলোকে মূলত আমরা তিনটা ক্যাটাগরিতে ভাগ করে আলোচনা করব।
প্রথমেই আসবে যারা হাইপো হাইপোতে সাফার করছে।হাইপো হাইপো বলতে আমরা কি বুঝি -আমাদের ব্রেনে পিটুইটারি বলে একটা গ্ল্যান্ড আছে, এই গ্ল্যান্ড থেকে FSH এবং LH নামে দুটো হরমোন আসে। এই হরমোন দুটো টেস্টিস এর উপরে কাজ করে টেস্টোস্টেরন রিলিজ করে এবং স্পার্ম তৈরি করতে সাহায্য করে। কোন কারনে যদি হাইপোথ্যালামাস বা পিটুইটারি সমস্যার কারণে পিটুইটারি গ্ল্যান্ড থেকে FSH বা LH না আসে তাহলে টেস্টিসে স্পার্ম বা টেস্টোস্টেরন তৈরি হবে না। এটাকেই বলা হয় হাইপো হাইপো।
হাইপো হাইপো পেশেন্টদেরকে আমরা যদি হরমোন রিপ্লেসমেন্ট করি অর্থাৎ তারা যে হরমোন এর ডেফিসিয়েন্সিতে সাফার করছে সেটা যদি রিপ্লেসমেন্ট দেওয়া হয় সাধারণত ৮০% ক্ষেত্রে তাদের স্পার্ম প্রোডাকশন শুরু হয়।
আমরা কিভাবে বুঝব যে তিনি হাইপো হাইপোতে সাফার করছেন ? সাধারণত তাদের কিছু হরমোন টেস্ট করা হয় যার মধ্যে আছে FSH, LH এবং টেস্টোস্টেরন। আমরা FSH, LH দুটোই কম পাব। টেস্টোস্টেরন ও কম পাব। এছাড়া ওই পেশেন্টের আমরা ফিজিক্যাল এক্সামিনেশন করতে পারি অথবা স্ক্রোটাল আল্ট্রাসনোগ্রাম ও করতে পারি। সেখানে আমরা উনার টেস্টিকুলার ভলিউমটা কম পেতে পারি। ট্রিটমেন্টের মধ্যে সাধারণত HCG ইনজেকশন দিয়ে থাকি সপ্তাহে দুইদিন। অনেক সময় HCG এর সাথে FSH ও দেয়া হয় সপ্তাহে দুই দিন করে। এবং HCG, FSH শুরু করার পর ইউজুয়ালি তিন মাস পর সিমেন এনালাইসিস করে দেখি। যদি আমরা দেখি যে সিমেনে স্পার্ম পাওয়া যাচ্ছে তাহলে এই ডোজ কন্টিনিউ করি। সাধারণত তিন থেকে ছয় মাস এটা কন্টিনিউ করা হয় এবং যদি বীর্যে স্পার্ম দেখা যায় তাহলে তারা স্বাভাবিকভাবে প্রেগনেন্সি ট্রাই করতে পারেন।
তবে এটা বলে রাখা জরুরি যে হাইপো হাইপো পেশেন্টের পার্সেন্টেজ সত্যিকার অর্থে খুবই কম। টোটাল ইনফর্টিলিটি পেসেন্ট এর মধ্যে অনলি ১% হাইপো হাইপো তে সাফার করে।এইজন্য যারা সাফার করছেন তাদেরকে যদি টাইমলি ডায়াগনোসিস করে হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি দেওয়া হয় তারা নরমাল প্রেগনেন্সির জন্য ট্রাই করতে পারেন।
এবারে আমরা সেকেন্ড যে গ্রুপটা নিয়ে কথা বলব তারা হচ্ছে অবস্ট্রাক্টিভ অ্যাযোস্পার্মিয়া- স্পার্ম যদিও টেস্টিসে প্রোডাকশন হচ্ছে, তারপরে তাকে একটা লম্বা রাস্তা পার হয়ে আসতে হয় যার মধ্যে আছে এ পি ডি ডাইমিস, ভাস এবং ইউরেথ্রা।এই রাস্তার কোথাও যদি ব্লক থাকে সেটাকেই বলা হচ্ছে অবস্ট্রাক্টিভ অ্যাযোস্পার্মিয়া।
- অবস্ট্রাক্টিভ অ্যাযোস্পার্মিয়া আমরা কিভাবে বুঝব?
এখানেও FSH, LH এবং টেস্টোস্টেরন করব। সাধারণত দেখা যায় যে উনাদের FSH, LH নরমাল থাকে, টেস্টোস্টেরন নরমাল বা কম ও থাকতে পারে। অনেক সময় রেক্টাল আল্ট্রাসনোগ্রাম করা হয় সেখানে এপিডিডাইমাল সিস্ট পাওয়া যেতে পারে।
যখনই কোন পেশেন্টের ডায়াগনোসিস হয় যে তিনি অবস্ট্রাক্টিভ অ্যাযোস্পার্মিয়া তে সাফার করছেন আমরা প্রথমেই একটু বোঝার চেষ্টা করি যে তার অবস্ট্রাকশন টা কিসের জন্য। সাধারণত দেখা যায় যে ইনফেকশন হতে পারে। ইনফেকশনের মধ্যে সবচেয়ে কমন হচ্ছে টিউবারকুলোসিস, STD(Sexually Transmitted Disease) থেকেও হতে পারে।এরপরে যে ব্যাপারটা আসে অনেক সময় দেখা যায় যে চাইল্ডহুড ট্রমা, এক্সিডেন্ট বা পোস্ট সার্জিক্যাল।হয়তো তার কখনো ফ্যামিলি প্ল্যানিং এর অপারেশন অর্থাৎ ভাসেকটমি করা হয়েছে। এই সবগুলো কারণেই তার অবস্ট্রাক্টিভ অ্যাযোস্পার্মিয়া হয়ে থাকে।
অবস্ট্রাক্টিভ অ্যাযোস্পার্মিয়ার পেশেন্টকে আমরা যদি অপারেশন করে তার অ্যাবস্ট্রাকশনটা ছাড়াতে পারিহয়তো সে ক্ষেত্রে তার স্পার্ম আবার সিমেন এ পাওয়া সম্ভব হতে পারে। এটা একধরনের মাইক্রো সার্জারি। এটা সাধারণত করে থাকেন ইউরোলজিস্টরা। ইউরোলজিস্টরা সাধারণত ভাসো ভাসোষ্টমী বা ভাসো এপিডিডাইমিওস্টোমি করে থাকেন। এখানে আমাদের একটা জিনিস মনে রাখতে হবে যে ভাস ডিফারেন্স এর ডায়ামিটার আসলে টু- থ্রি মিলিমিটার।এত সরু একটা ক্যানালকে রিকনস্ট্র্যাকটিভ সার্জারি করে এটার পেটেন্সি মেনটেইন করা আসলেই খুব কঠিন। সেজন্যেই দেখা যায় যে অবস্ট্রাক্টিভ সার্জারি অপারেশন করার পর ২০%-৪০% ক্ষেত্রে তাদের সিমেনে স্পার্ম পাওয়া যায় এবং এখানে যদি আবার আমরা বলি যে যাদের সিমেনে স্পার্ম পাওয়া যাচ্ছে তাদের প্রেগনেন্সির রেট কেমন সেটা হচ্ছে ১০%-২০%। এই ১০%-২০% এর মধ্যে মেজর পেশেন্টই হচ্ছে যাদের ভাসেকটমির জন্য অবস্ট্রাক্টিভ অ্যাযোস্পার্মিয়া তাদের এই রিকনস্ট্র্যাকটিভ সার্জারির পর সিমেনে স্পার্ম পাওয়ার চান্স যেমন বেশি, তাদের প্রেগনেন্সির চান্স টাও বেশি এবং আমরা যে বলছি আমাদের চান্স অফ সাকসেস ১০% – ২০% এই গ্রুপটা মূলত এরাই কাভার করে ।
থার্ড যে পেশেন্ট গ্রুপ যাদেরকে আমরা আইভিএফ ছাড়াও প্রেগনেন্সির জন্য বলতে পারি তারা হলো প্রথমেই একটা গ্রুপ থাকেন যে যারা নিজেরা জানেন যে তাদের কোন ফার্টিলিটি প্রবলেম আছে।তারা বিভিন্ন অনলাইনে দেখে বা মানুষের কাছে শুনে মনে করেন যে টেস্টোস্টেরন একটা ফার্টিলিটি ড্রাগ। সো এটা নিলে নিশ্চয়ই আমার ফার্টিলিটি ইম্প্রুভ করবে।এছাড়াও আজকের সমাজে লোকজন অনেক স্বাস্থ্য সচেতন বিশেষ করে অনেক ছেলেই জিমে যান তাদের বডি বিল্ডিং এর জন্য, তাদের মাসেল বাল্ক ইমপ্রুভ করার জন্য এবং এটার জন্য তারা অনেক সময় টেস্টোস্টেরন ইনজেকশন বা জেল ব্যবহার করে থাকেন। ইভেন অনেকে এনাবলিক স্টেরয়েড ও নিয়ে থাকেন। এই জিনিসগুলো আমরা যেটা মনে করি যে এটা নিলে আমাদের ফার্টিলিটিতে কোন ক্ষতি হওয়ার কথা না বিকজ টেস্টোস্টেরন একটা ফার্টিলিটি হরমোন।
বাট আসলে ব্যাপারটা সম্পূর্ণই অপজিট। আমরা যখন বাইরে থেকে টেস্টোস্টেরন নিব – এটা আমাদের শরীরের ভেতরে যেয়ে পিটুইটারি গ্ল্যান্ড থেকে FSH এবং LH আসা বন্ধ করে দেয়। FSH, LH না আসলে এটা টেস্টিসকে স্টিমুলেট করবে না অর্থাৎ টেস্টোস্টেরন এবং স্পার্ম তৈরি বন্ধ হয়ে যাবে। যারা টেস্টোস্টেরন ইনজেকশন বা জেল নিচ্ছেন একটা সময় পরে দেখা যায় যে তাদের ৬০% থেকে ৮০%ক্ষেত্রে তাদের স্পার্ম এর কোয়ান্টিটি একদম ড্রাস্টিক্যালি ফল করে ইভেন তারা এজোস্পার্মিয়াতেও সাফার করেন। এবং Infertility এর পাশাপাশি তারা আসলে Impotency সাফার করেন।
এই ব্যাপারটা যখন ডায়াগনোসিস হয় তখন আমরা যদি ইনজেকশনটাকে ডিসকন্টিনিউ করি তখন দেখা যায় যে তিন থেকে ছয় মাস পর তাদের আবার স্পার্ম প্রোডাকশন শুরু হয়। আমরা যখনই ড্রাগ বন্ধ করব তিন মাস পর আবার একটা স্যাম্পল পরীক্ষা করে দেখব যে ওনার স্পার্ম প্রোডাকশন স্বাভাবিক হয়েছে কিনা। তবে যদি এ ধরনের অ্যাবিউজ লম্বা টাইম ধরে চলে অর্থাৎ টেস্টোস্টেরন ইনজেকশন বা এনাবলিক স্টেরয়েড কেউ যদি দীর্ঘদিন ধরে নিতে থাকে তাহলে ট্রান্জিয়েট এজোস্পার্মিয়া একটা সময় যেয়ে ইরিভারসিবল এজোস্পার্মিয়া হয়ে যায় অর্থাৎ এটা ডিসকন্টিনিউ করে স্পার্ম প্রোডাকশন ফিরিয়ে আনা যায় না।সেইজন্য আমরা বলব যে আপনারা যারা এ ধরনের ট্রিটমেন্ট নিচ্ছেন বা নেয়ার কথা চিন্তা করছেন আপনি ১০০ বার চিন্তা করবেন এটা নেওয়ার আগে এবং যারা ফাটিলিটি সংক্রান্ত প্রবলেমে ভুগছেন তারা এ ধরনের ট্রিটমেন্টে যাওয়ার আগে অবশ্যই আপনার ফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞর সাথে পরামর্শ করবেন।তিনি আপনাকে বলে দিবেন আসলে আপনার কি নেওয়া উচিত।
আমাদের এই আলোচনা থেকে আমরা যেটা দেখলাম যে আসলে ইনফাটালিটিতে যে পুরুষরা সাফার করছেন তাদের খুব নগণ্য একটা সংখ্যা যারা মেডিসিন নিয়ে অথবা সার্জারি করে অথবা তাদের চলমান ইনজেকশন টাকে বন্ধ করে আইভিএফ ছাড়া বাচ্চার জন্য চেষ্টা করতে পারেন। তবে মেজরিটি ক্ষেত্রেই তাদেরকে IVF, TESA, PESA, MicroTESE এর সাহায্য নিতে হয়।
আজকের এই আলোচনার উদ্দেশ্য হল যে যখনই কারো অ্যাজোস্পার্মিয়া ধরা পড়ে তিনি খুবই ভেঙে পড়েন।মনে করেন যে এটার কোনই ট্রিটমেন্ট নেই। আবার অনেক সময় তারা মনে করেন যে এটা ট্রিটমেন্ট হয়তো এতটাই লম্বা সময় ধরে চলে এবং জটিল যে তারা এটা নিয়ে কারো সাথে পরামর্শই করেন না।
যে সব ক্ষেত্রে মেডিসিন বা Surgery ট্রিটমেন্ট আছে সেখানে অবশ্যই ট্রিটমেন্ট নিবেন। যে সব ক্ষেত্রে সাধারণ ট্রিটমেন্ট নেই, IVF বা TESA/PESA এর মাধ্যমে সন্তান নিতে হবে সেটা আপনি আপনার ফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞর সাথে পরামর্শ করে ঠিক করবেন। তার মানে আমরা আপনাকে যে মেসেজটা দিতে চাচ্ছি সেটা হচ্ছে যে অন্যান্য আর দশটা সমস্যার মতোই আপনি অ্যাযোস্পার্মিয়াকে ট্রিট করবেন, আপনার শুধু দরকার আপনার ফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞর সাথে পরামর্শ করবেন। তিনি আপনাকে গাইড করবেন আপনার কি করা উচিত।
বিস্তারিতঃ https://www.facebook.com/reel/1563643224281565